তরল চুম্বক পদার্থ

তরল চুম্বক পদার্থ

জিনিসটা চুম্বক জাতীয়। তবে গতানুগতিক নয়। একটু ভিন্ন রকমের। সাধারণ চুম্বক লোহা দিয়ে তৈরি। কিন্তু ভিন্ন ধাঁচের এ চুম্বকে লৌহ তো দূরের কথা কোনো ধাতব উপাদানই নেই। বরং এটি এক ধরনের জৈব যৌগ আর গঠন ও বেশ সাধারণ। কার্বন, নাইট্রোজেন এবং সালফার দিয়ে এর অণু গঠিত। অণুগুলোর ভরও কম। যৌগটি দেখতে অনেকটা প্লাস্টিকের মতো। এ ধরনের চুম্বকের চুম্বকত্ব ছাড়াও আরো কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। যেমন- এটি স্বচ্ছ, নমনীয়, ওজনের হাল্কা এবং এমনকি ইনস্যুলেটিং বৈশিষ্ট্যও আছে।

তরল চুম্বক পদার্থ

বিচিত্র এ জিনিষ হয়তো চুম্বকের স্বয়ংসম্পূর্ণ বিকল্প হতে পারবে না, তবে এটি পরীক্ষামূলক বিজ্ঞানে যে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নিবে তাতে অনেকেরই কোনো সন্দেহ নেই। একে অত্যাধুনিক স্মার্ট কার্ড টেকনোলজিতে ব্যবহার করার উপযোগীতা রয়েছে।

ধাতব চুম্বকের চুম্বকত্ব তাদের ইলেকট্রনিক গঠনের অবদান। নতুন ধরনের চুম্বক নিয়ে গবেষণার অন্যতম পথিকৃত হচ্ছেন জার্মি র্যসন, ইউনিভার্সিটি অব কেমব্রিজের রসায়ন বিভাগে কাজ করছেন। তার আবিস্কৃত চুম্বকটির মূল উপাদান ডায়থায়াডাইএজোলাইল। এ অণুতে বিশেষ ধরনের এক জোড়া ইলেকট্রন থাকে এবং যৌগটির চুম্বকত্বের মূলেও আছে বিশেষ এই ইলেকট্রন জোড়া। র্যচসনের অণুতে ডাইথায়ডাইএজোলাইন, সায়ানাইড গ্রুপের সাহায্যে হেড টু টেইন বিন্যাসে পরস্পর যুক্ত থাকে। আবার, সালফারের সাহায্যে একই অণু পাশের আরেকটি অণুর সাথে যুক্ত থাকে। বিশেষ গঠনের কারণে যৌগটি চুম্বকত্ব ও নমনীয়তা প্রদর্শন করে।

এ জাতের চুম্বকের আরো একটি অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য আছে- এরা বিশেষ কিছু তরলে দ্রবীভূত হয়। তাই ম্যাগনেটিক ফিল্ম তৈরিতে এ যৌগটি বেশ সহায়ক। উপযুক্ত তরলে যৌগটি দ্রবীভূত করে, কোনো পাতে রেখে শুকিয়ে তরলটি বাষ্পীভূত করা হলে যৌগটি ফিল্ম আকারে উদ্ধার করা যাবে। সাধারণ তাপমাত্রায়ও এ ধরনের ফিল্ম তৈরি করা সম্ভব। অপরদিকে লৌহ ও ক্রোমিয়াম অক্সাইডের ফিল্ম তৈরি বেশ ঝামেলার। কারণ এরা সাধারণ তাপমাত্রায় দ্রবীভূত হয় না। তাই ফিল্ম তৈরি করার জন্য প্রায় কয়েকশ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা প্রয়োজন।

র্য্সনের নমনীয় চুম্বক প্রচলিত চুম্বকের চেয়ে গঠনে ভিন্ন হলেও উভয়ের চুম্বকত্বের মূল রহস্য একই জায়গায়। উভয় ক্ষেত্রে মুল কারণ ইলেকট্রন। পরমাণুর ভেতর ইলেকট্রন সব সময় ঘুরতে থাকে। ঘূর্ণনের ফলে প্রতিটি ইলেকট্রনের চারদিকে একটি ক্ষুদ্র চুম্বক ক্ষেত্রে তৈরি করে। ইলেকট্রনের দু’ধরনের ঘূর্ণন সম্ভব। পরমাণুর অধিকাংশ ইলেকট্রন এবং অণুর বন্ধনে ইলেকট্রন জোড়ায় জোড়ায় থাকে। প্রতি জোড়ায় একটি ঘূর্ণন দিক অপরটি বিপরীত। ফলে, একটির চুম্বকত্ব অপরটি দ্বারা নষ্ট হয়ে যায়। ফলে, অণুটিতে চূড়ান্তভাবে কোনো চুম্বকত্ব দেখা যায় না। কিন্তু কোনো অণুতে যদি এক বা একাধিক জোড়হীন ইলেকট্রন পাওয়া যায় তাহলে অণুটিতে চুম্বকত্ব তৈরি হবে।

যেমন- লোহার প্রতিটি অণুতে চারটি জোড়াহীন ইলেকট্রন আছে। লোহা থেকে তাই চুম্বক বানানো যাবে আবার, র্য্সনের ডইথায়াডাইএজোলাইল একটি করে জোড়হীন ইলেকট্রন দেখা যায়। এ ধরনের যৌগ সাধারণত: অস্থায়। তবে চার দিকের নাইট্রোজেন ও সালফারের প্রভাবে যৌগটি স্থায়ী। চুম্বকত্বের জন্য জোড়হীন ইলেকট্রনগুলো একই দিকে সাজানো থাকতে হবে এবং এদের যৌথ প্রভাবই চুম্বকত্ব গুণটি সৃষ্টি করে। কিন্তু যৌথ প্রভাব তখনই কাজ করে যখন ইলেকট্রনগুলো পরষ্পরের যথেষ্ঠ কাছাকাছি অবস্থান করে। সাধারণত একটি ছোট্ট এলাকায় এ ধরনের প্রভাব তৈরি হয়। এলাকাটিকে নাম দেয়া হয়েছে ‘ডোমেইন’। যদি কোনো পদার্থের সবগুলো ডোমেইন একই দিকে সাজানো থাকে তাহলে বস্তুর চুম্বকত্ব শক্তিশালী হবে। অন্যথায়, কোনো চুম্বকত্ব থাকবে না।

যে সমস্ত বস্তুর সমস্ত ইলেকট্রন ঘূর্ণনকে একই দিক বরাবর সাজানো যায়, তাদেরকে ফেরোম্যাগনেটিক বস্তু বলা হয়। আর যদি ইলেকট্রনের ঘূর্ণন পরস্পর বিপরীত হয় তাহলে সে ধরনের বস্তুকে এন্টিফেরোম্যাগনেটিক বস্তু বলা হয়। র্যসসনের বস্তু এন্টিফেরোম্যাগনেটিক ধরনের হলেও একটু ভিন্ন। ডাই থায়াডাইএজোলইল-এর অণুগুলোর সংযোগের বিশেষ বৈশিষ্ট্যের প্রভাবে চূড়ান্তভাবে এতে কিছু চুম্বকত্ব পাওয়া যায়। এ ধরনের চুম্বকত্ব লোহার চুম্বকের তুলনায় এক হাজার ভাগে এক ভাগ। তবে, বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে এর চুম্বকত্ব বাড়ানো সম্ভব।

এখনো বিশেষ একটা বাধা রয়ে গেছে- উচ্চ তাপমাত্রায় জৈব চুম্বকের চুম্বকত্ব বজায় না থাকা সুপারকন্ডাক্টরের মতো জৈব চুম্বকও নিম্ন তাপমাত্রায় কার্যক্ষম। ১৯৯১ সালে সর্বপ্রথম অধাতব চুম্বক তৈরি করা হয়। তবে, এটি ০.৬ ক্যালভিন তাপমাত্রায় কার্যক্ষম ছিল। র্য্সনের চুম্বক ৩৬ ক্যালভিন পর্যন্ত কর্মক্ষম। এটিও যথেষ্ঠ শীতল, তবে প্রথমটির তুলনায় দ্বিতীয়টি বেশ সফল।

যে তাপমাত্রায় চুম্বক তার চুম্বকত্ব হারায় সেটি হচ্ছে ঐ চুম্বকের কুরী তাপমাত্রা। চুম্বকের কুরি তাপমাত্রা তার গঠনগত উপাদানের উপর নির্ভর করে। তাপমাত্রার কারণে জোড়হীন ইলেকট্রনগুলোর ঐক্য নষ্ট হয়ে যায় অর্থাৎ এলোমেলো হয়ে যায়। এ কারণে চূড়ান্তভাবে বস্তুটির চুম্বকত্ব থাকে না, লোহার ক্ষেত্রে কুরী তাপামত্রা ১০০০ ক্যালভিনের উপরে। অপরদিকে, জৈব চুম্বকের উপর তাপমাত্রার প্রভাব লক্ষ্য করার মতো। যেমন- র্য০সনের চুম্বক ৩৬ ক্যলভিনের উপর চুম্বকত্ব দেখায় না।

বিজ্ঞানীরা আশা করছেন যে, এমন জৈব চুম্বক তারা তৈরিতে সক্ষম হবেন, যার কুরী তাপমাত্রা সাধারণ তাপমাত্রার চেয়ে বেশি হবে। সমস্যার একটি সম্ভাব্য সমাধান হবে যৌগটির গঠনে কিছুটা পরিবর্তনের মাধ্যমে। যৌগটির অণুগুলোর গঠন এমনভাবে পরিবর্তন করতে হবে যে, এদের জোড়হীন ইলেকট্রনগুলো পরস্পরের আরো কাছাকাছি অবস্থান করবে। ফলে চুম্বকের ডোমেইনগুলো যেমনি আকারে বড় হবে তেমনি এদের শক্তিও বৃদ্ধি পাবে। সে সাথে কুরি তাপমাত্রাও বাড়বে।

কিন্তু জৈব চুম্বকের ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি ব্যবহারের একটি সীমা আছে। সীমার বাইরে চলে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে। বস্তুটির পুরো চুম্বকত্বই হারিয়ে যেতে পারে। র্যরসনের চুম্বকে ফ্লোরিন পরমাণুর সাহায্যে অণুগুলোকে দূরে দূরে রাখা হয়।

র্যেসন তার চুম্বকের চুম্বকত্ব বাড়ানোর ব্যাপারে বেশ আশাবাদী। তার ধারণা সালফারের পরিবর্তে সেলেনিয়াম বসালে ভালো কিছু ঘটতে পারে। সেলেনিয়ামের কারণে ডাইথায়াডাইএজোলাইল মূলকগুলোর মাঝে আকর্ষণ বাড়াবে। ফলে চুম্বকের চৌম্বকক্ষেত্রে বৃদ্ধি পাবে। অর্থাৎ তাপমাত্রার বিরুদ্ধে চৌম্বকত্ব ধরে রাখার ক্ষমতা বাড়াবে।

এছাড়া অণুগুলোর মাঝে আরো এক ধরনের পরিবর্তন লাভজনক হতে পারে। এ ধরনের মূলকের পরমাণুগুলোর মাঝে ক্রিয়াশীল বন্ধন একক বন্ধনে সীমাবদ্ধ না রেখে তাদের মাঝে দ্বি-বন্ধন বা ত্রি-বন্ধন তৈরি করা যেতে পারে। দ্বি-বন্ধনে একটি পাই বন্ধন আর ত্রি-বন্ধনে দুটি পাই বন্ধন থাকে। পাই বন্ধন হচ্ছে মূল বন্ধনের সহায়ক বন্ধন। এধরনের ইলেকট্রন অণুগুলোকে আরো কাছাকাছি রাখে।

ল্যাবরেটরি অব মলিকিউলার সায়েন্সে কাজ করছেন অলিভার কান। তিনি ধাতু পরমাণু সমৃদ্ধ এমন জৈব বস্তু বানানোর চেষ্টা করছেন, যা তথ্য সংরক্ষণ করতে পারে। তিনি আয়রন ১, ২, ৪ ট্রাইএজোল নিয়ে কাজ করছেন। যৌগটির ধাতব (আয়রণ) অংশ জৈব অংশের ফ্রেম ওয়ার্ক দিয়ে ঘেরা থাকে। লোহার জোড় হীন ইলেকট্রনের ঘূর্ণনের মাধ্যমে তথ্য জমা রাখা যেতে পারে। কান আশাবাদী যে, এ ধরনের বস্তু তথ্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমে হয়ে উঠতে পারে। এ ধরনের চুম্বকের দু’ধরনের স্থিতি অবস্থা থাকে নিু শক্তি অবস্থা এবং উচ্চশক্তি অবস্থা। এধরনের বস্তুর অন্যতম ব্যবহার হতে পারে স্মার্ট কার্ডে। ক্রেডিট সুইস অন/অব করার কাজে বস্তুটিকে কাজে লাগানো যেতে পারে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ